সিরিয়ার_কারাগারে_নারী_নির্যাতনের_শিকার_হচ্ছে



মুনা মুহাম্মাদের এক একটি ক্ষণ মনে আছে৷ বন্দি জীবনের প্রতিটি ক্ষণ, প্রতিটি যন্ত্রণা আর অত্যাচার৷ ‘‘আমার মাথা একটি প্লাস্টিক ব্যাগ দিয়ে বাধা ছিল৷ এরপর উলটো করে সিলিং থেকে ঝুলিয়ে দিয়েছিল,'' বলছিলেন ৩০ বছর বয়সি মুনা৷

এই দুঃসহ স্মৃতি তাঁকে এখনো তাড়িয়ে বেড়ায়৷ কারাকক্ষের প্রহরী বলছিলেন, এভাবে মাথার ভেতর থেকে সব ‘কুচিন্তা' বেরিয়ে আসবে৷

সিরিয়ায় সংগীতের শিক্ষক ছিলেন মুনা৷ দাঈর এজ-জর-এ প্রেসিডেন্টবাশার আল আসাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকরায় ২০১২ সালে গ্রেফতার হন তিনি৷ জিজ্ঞাসাবাদের পর ছেড়ে দেয়া হলেও সেনা গোয়েন্দারা পরে আবার তাঁকে গ্রেফতার করেন৷ তাঁকে দামেস্কে নিয়ে আসা হয়৷ সিরিয়ার সামরিক গোয়েন্দাদের যেই সেলটি তাঁকে গ্রেফতার করেছে, সেই সেলকে ‘ব্রাঞ্চ অফ হেল' বা ‘নরকের শাখা' বলে ডাকা হয়৷ যে লোকটি তাঁকে অত্যাচার করছিলেন, একদিন তিনি মুনাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘তোমার হৃৎপিণ্ড কোথায়?'' মুনার ভাষায়, ‘‘আমি আঙুল দিয়ে দেখাতেই, সেখানে আঘাত করা হলো৷''

নরকের শাখার দিনগুলি

মাসের পর মাস মুনাকে কখনো একটি নির্জন কক্ষে বা কখনো অন্যদের সঙ্গে বন্দি রাখা হতো৷

মুনা মুহাম্মাদ

‘‘একদিন তারা এক ষোড়শী তরুণীকে জিজ্ঞাসাবাদ করছিলেন৷ আমরা তাঁর চিৎকার শুনছিলাম৷ মনে হচ্ছিল, তারা হয়তো মেয়েটিকে মেরে ফেলছে৷'' অনেক নারীকে ধর্ষণ করা হয়৷ অপরাধ স্বীকার না করলে তাঁকেও ধর্ষণ করার হুমকি দেয়া হয়েছিল বলে জানান মুনা৷

কারাগারে সবসময় টয়লেটে যাওয়া বা গোসল করার অনুমতি ছিল না মুনাদের৷ বন্দিদের সঙ্গে শিশুও ছিল৷ ‘‘এক মা ও মেয়ের কথা মনে আছে৷ অন্ধকার ঘরে শিশুটি সারাদিন কাঁদতো৷ আর দরজার নীচ দিয়ে আলো ধরার চেষ্টা করতো,'' বলছিলেন মুনা৷

এক সময় মুনাকে ছেড়ে দেয়া হয়৷ ২০১৬ সালে তিনি তুরস্কে পালিয়ে যান৷ আরো প্রায় পাঁচ লাখ সিরীয় নাগরিকের সঙ্গে তুরস্কের গাজিয়ানটেপ শহরে থাকেন তিনি৷

কত নারী সিরিয়ার কারাগারগুলোতে অন্তরীণ আছেন, তা নিশ্চিত নয়৷ তবে সেখানকার নাগরিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করে, এমন একটি এনজিও'র কর্ণধার ফাদেল আবদুল ঘানির মতে, সাত হাজারেরও বেশি নারীকে বন্দি করা হয়েছে৷

‘পরিকল্পিত নির্যাতন'

২০১৭ সালে প্রকাশিত অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কারাগারে সিরীয় গোয়েন্দা সংস্থার অত্যাচারে কমপক্ষে ১৭ হাজার নাগরিক মারা গেছেন৷ সেইদনায়া সামরিক কারাগারে প্রায় ১৩ হাজার নাগরিককে হত্যা করা হয়েছে৷ অ্যামনেস্টি এই হত্যাযজ্ঞকে সাধারণ নাগরিকের ওপর সরকারের ‘পরিকল্পিত নির্যাতন' বলে উল্লেখ করেছে৷

বাশার আল-আসাদ অবশ্য এই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন যে, এটি ভুয়া খবর৷

প্রতিকার প্রকল্প

সিরিয়ার কারাগারগুলোতে কী হচ্ছে তা বিশ্বকে জানাতে চান মুনা৷ তিনি বলেন, কথায় কথায় অপমান করা অত্যাচারের একটি অংশ ছিল৷ একটি ঘটনার কথা মনে পড়ে তাঁর৷ এক ব্যক্তির কাছে তাঁর পেশা কী জানতে চাইলেন প্রহরী৷ লোকটি জানালেন, তিনি একজন ডাক্তার৷ এরপর ঐ প্রহরী তাঁকে বললেন, এক পায়ের ওপর লাফিয়ে লাফিয়ে বলতে যে, তিনি একটি খরগোশ৷

‘‘লোকটি প্রথমে আস্তে আস্তে বলছিলেন৷ প্রহরীরা তাই তাঁকে মারছিল৷ এরপর লোকটি জোরে জোরে বলছিল যে, আমি খরগোশ, আমি খরগোশ৷''

মুনা তাঁর জীবনের গল্পটি লিখেছেন৷ নির্যাতনের শিকার অন্য নারীদের ঘটনাগুলোও লিখে রাখছেন তিনি৷ এই নারীদের জন্য একটি ‘প্রতিকার প্রকল্প' চালু করেছেন তিনি৷

‘‘অনেকেই কারাগারে কী ঘটেছে, তা নিয়ে কথা বলতে চান না৷ অন্যরা এতটাই ভেঙে পড়েন যে, কান্না থামাতে পারেন না৷'' বলছিলেন মুনা৷ ‘‘আমি তাঁদের শক্ত থাকার পরামর্শ দিই৷ বলি যে, যা ঘটেছে তার জন্য তাঁরা দায়ী না৷'' তিনি বলেন, ‘‘আমি তাঁদের নতুন জীবন শুরু করার কথা বলি৷''

তুরস্কে মুনা তাঁর নতুন জীবন শুরু করেছেন৷ তবে একদিন তাঁর ওপর যে অত্যাচার হয়েছে, এর বিচার পাবেন সে প্রত্যাশা করেন তিনি৷

Comments

Popular posts from this blog

হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু'র প্রকৃত হত্যাকারী কে....?

কেমন ছিলেন ফুরফুরা শরীফের পীর কাউয়ুম জামান আবু নসর আব্দুল হাই সিদ্দিকী (রহঃ)

নামধারী আহলে হাদিস বিদাতী ফিরকার ইসলাম বিরোধী ৫০টি ভ্রান্ত মতবাদ